একটি ক্যাম্পাস প্রেমের করুণ কাহিনী

Adrita Kar

ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে ঝাঁকড়া গাছটার নীচে দাঁড়িয়েছিলাম সবে……পকেট থেকে সিগারেট টা বার করে জালিয়েছি যেই অমনি দেখি সামনে……….না না যমদূত নয়……. সাক্ষাত্‍ যম নিজেই…….pediatricsএর hod স্যার……..হুলোবেড়ালের মত জুল্জুলে চোখে তাকিয়ে আছেন। সিগারেট টা ফেলে দিয়ে একটা দেঁতো হাসি হাসলাম……বাবার ছোটবেলার বন্ধু বলে কথা…..মনেমনে যাই গালাগাল দিই না কেন……উপরে উপরে নৈব নৈব চ………..
“এদিকে আয়”……বজ্রনির্ঘোষ……. “তোর বাবা জানে ছেলে যে বাপের পয়সায় বিড়ি ফুকতে শিখেছে?
ব্যাটা পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা, বিড়ি ফুকছে দেখ স্টীমইঞ্জিনের মতো। সেমিস্টারে কত পেয়েছিস শুনি?”
আমি জানি এসব ব্যাপারে চুপচাপ থাকায় ভাল……গোবেচারার মতো মুখটা দেখে দয়া হল বোধয় স্যারের…… “ পড়াশোনাটাও তো করতে হবে নাকি? দিনরাত তো মেয়েটার সাথে টোটো করে ঘুরিস…ওকে দেখেও তো শিখতে পারিস গাধা কোথাকার…….এখন যা , এবার ছেড়ে দিলাম…..নেক্সট টাইম দেখলে কিন্তু বাড়িতে ফোন করে রমা বৌদিকে সব কথা বলে দেবো…..”
মনেমনে ভাবলাম আর একটা তো বছর, তারপর তোমার বৌদিবাজি আমি বার করছি দাঁড়াও না, মুখে বললাম “ আর হবে না, সরি স্যার ”
মানেমানে পিঠটান দিচ্ছি, চোখের কোন দিয়ে দেখলাম, ব্ল্যাকক্যাট কমান্ন্ডোর মতো নিঃশব্দে পা টেনেটেনে সুড়ুত্‍ করে পালালো শিলাজিত…….তৃণার চর ……বুঝলাম আজ আর রক্ষে নেই। ব্যাজার মুখে হোষ্টেলে এলাম…..ঘরে দেখি প্রণয় পরীক্ষার পড়া তৈরি করার মতো করে প্লেবয় ম্যাগাজিনে এক স্বল্পবসনা সুন্দরীর ছবি মুখস্থ করছে……আমাকে দেখে বললো “ কী বস চলবে নাকি?” সাবধান হয়ে গেলাম…….এও তৃণার আর একটা চর…..আমার প্রবৃত্তি কে জাগিয়ে তুলে এখুনি বাইরে গিয়ে তৃণাকে ফোন করে খবর দেবে……মুখে বললাম …. “ না ভাই আমি এখন রিটায়ার করার কথা ভাবছি”
বাথরূম থেকে সবে পেটটা খালাস করে এসেছি…..অমনি মোবাইল টা বাজতে শুরু করল…..বলে না….যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়…..”হ্যালো তৃণা?” গলাটা যথাসম্ভব মোলায়ম করে বলি।
অপর দিক থেকে নারীকণ্ঠে রাগত উত্তর “ না, ক্যাটরিনা কাইফ বলছি ……তুই শুনলাম hod স্যারের সামনে বিড়ি খাচ্ছিলি? ছিছি অর্চিষ্মান বয়স তো কম হল না , কবে আর বড় হবি? আর হ্যাঁ গত সপ্তাহে না তুই আমার দিব্যি করেছিলি যে আর বিড়ি খাবি না ?” মেজাজ এমনিতেই গরম হয়ে আছে, মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিলো….ওটা capstan সিগারেট তৃণা, ওটার দাম আছে , ওটা বিড়ি নয় মোটেই……আর আমি তোর বাপের মতো হাড়কেপ্পন নই যে বিড়ি খাবো……কথাটা গিলে ফেললাম……গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে কী লাভ? শেষে আমকেই তো সন্ধির সাদা পতাকা নাড়াতে হবে……
কাজেই বললাম “ সরি তৃণা ভুল হয়ে গেছে, এবারটা ছেড়ে দে প্লীজ……….”
“ আর কতবার সরি বলবি অর্চিষ্মান? তুই আমার কোনও কথা শুনিসনা……আমার দিব্যি অব্দি মানিস না….. আসলে তুই আমাকে ভালোই বাসিস না……” বুঝলাম মহারানি ভিক্টোরিয়ার ভালোই রাগ হয়েছে…..এমনি তে তৃণা আমায় অর্চি বলে, mild রেগে গেলে অর্চিষ্মান আর severe রেগে গেলে বলে অর্চিষ্মান সেনগুপ্ত…..তাই আমতা আমতা করে বলি “ আরে একটা মাইনর ভুল হয়ে গেছে তৃণা….. প্লী-ই-ই-ইজ”……..বিরক্ত লাগছে একে এই চাঁদিফাঁটা গরম…তার ওপর ফোনে ওপর থেকে তৃণা ফ্যাচর ফ্যাচর করে কেঁদেই চলেছে……একটুও ভাল লাগছে না……..কী মতিভ্রমে যে প্রেম করেছিলাম……কে জানে।
প্রথম প্রথম, তৃণার কান্না খুব ভাল লাগতো…..চুড়ির আওয়াজের মতো মিষ্টি টুঙ টাং, এখন মনে হয় কাবলে বেড়ালের সর্দি আর সাথে intermittently রিকশার ভেপু বাজছে…ভ্যাঁ….কু ভ্যাঁ…….কু……..
বিরক্তি গোপন করার জন্য একটু ছলনার আশ্রয় নিই…… “ হ্যাঁ তৃণা……কী বলছিস? কিচ্ছু শুনতে পারছিনা……bsnlএর বোধয় টাওয়ার নেই……কী……? আচ্ছা রাখছি”। তৃণা টা এত কাঁদতে পারে না, pwdকে বলতে হবে ওর ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড থেকে ডাইরেক্ট ট্যাঙ্কের লাইন টানতে…..কলেজের জলের কষ্ট মিঠে যাবে!
ফোন রেখে এবার শান্তি…….বিছানায় লম্বা দিয়ে কড়িকাঠের দিকে মুখ করে যোগনিদ্রা…..এই সেরেছে ভাল মনে পড়েছে ফোন টা সাইলেন্ট করে রাখি…নো তৃণা নো চিন্তা।
বেশ তো ছিলাম……বাপের এক ছেলে , বাবার হোটেলে দুবেলা যুতচ্ছিল পোলাওকালিয়া……বাবা চমবের থেকে ফিরেই আমার পেছনে পড়ে যেত…….কোনদিন ফিজিক্স নিয়ে , কোনও দিন কেমিস্ট্রি…….স্কুল যেতাম সুবোধ বালকের মতো……ফিরে এসে দিদির সাথে প্রাণের যত কথা……এমন কী কোন মেয়েটাকে ভাল লাগে তাও অবধি……
এর মধ্যে আমার বাবার মাথায় বোধহয় বয়সের দোষেই ভিমরতি দেখা দিল……কী না দিদির বিয়ে দিতে হবে…..কেন বাপু……একটা যাওবা আমার পক্ষে কথা বলার লোক ছিল তাকে বিদায় করা।
ভগবানের কাছে খুব করে প্রার্থনা করলাম হে ভগা…..একটা কথা রাখো…..প্লীজ দিদির জন্য পাত্র জুটিওনা…….থাক না আইবুড়ো হয়ে বসে……এখন বাবা খাওয়াবে…..আর আমি বড় হলে আমি!
তা সেই বুড়ো ভদ্রলোক কী কোনদিন আমার কথা শুনেছেন? তিনমাসের মধ্যে নিলয়দার খোজ পাওয়া গেলো আর ছ’মাসের মধ্যে বিয়ে…….মায়ের তো মুখে হাসি আর ধরে না……জামাই তো নয় যেন বিলেতের লাটসাহেব…..আরে বাবা বিয়ে যেন আর কারো হয় না……নিলয় খুব ভাল ছেলে…..নিলয় আমাদের ছেলের মতো….শুনলেই রাগ ধরে…..আমাকে কী ধাপার মাঠ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলে, যে নিলয়কে ছেলে পাতাতে হল? আর দিদি? সেটা তো সব থেকে বেশি বিশ্বাসঘাতক….দিনরাত শুধু নিলয়দার সাথে হিহিহি আর হাহাহা….যত সব আদিক্ষ্যেতা। আমি ঠিক চিনে গেছি এই নিলয়দা হচ্ছে আমার নাম্বার ওয়ান এনিমি….. আমার জায়গা কেড়ে নিতে এসেছে…..তবে আমিও তেমন…..বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচ্যগ্র মেদিনী। তা যতই তিনি আমার জয়েন্ট পাওয়ার জন্য পার্টি দিন আর মাসে মাসে আমার জন্য দামী দামী ডিও, বই, সিডি গিফট পাঠান……এই নিলয়দা হচ্ছে ছদ্মবেশী শয়তান…আমার সুখের ইডেন উদ্যানে প্রবেশ করেছে….এমনকি রাস্কেলটার এত বড় সাহস তৃণা কে অব্দি ফোন করে গেঁজায় । তবে আর বলে কী লাভ….তৃণাটা তো ঘরশত্রু বিভীষণ…..বলে কিনা নিলয়দা খুব খুব ভাল ছেলে…..আমার মাথায় পোকা আছে তাই আমি ওরকম ভাবি!
তা আর বলতে…… মাথায় তো পোকা আছেই , নাহলে কী আর প্রেম করতে গিয়ে হাতে হ্যারিকেন হই? একে তো আমার মতো শান্তশিষ্ট ছেলে……তার কিনা সাধ গেলো প্রেম করতে, টাও আবার তৃণার মতো ডাকসাইটে সুন্দরীর সাথে? আসলে আমার দোষ নেই……একে তো কাঁচা বয়েস…. তার ওপর যদি নিত্যি তিরিশদিন ল্যাব করতে গিয়ে তৃণার মতো মেয়ের সাথে হাতে হাত ঠেকে…..আর মাইক্রোস্কোপ দেখতে গিয়ে মাথা ঠোকাঠুকি হয়……তবে কোন মুনির না মন টলে? তবে আমি ঠিক তৃণাকে যে পটাতে চেয়েছিলাম সেটা নয়……স্ট্রেট ব্যাটে খেলছিলাম…….লাগলে ছককা না লাগলে ফক্কা……এত বাঘা বাঘা খেলোয়াড় লাইন দিয়েছিল তৃণার পেছনে যে ভাবতেই পারিনি তৃণা শেষ অবধি পচা শামুকে পা কাটবে।
তাও বা ঠিক ছিল, তৃণা পটলো তো পটলো….এরকম যে irreversibly পটে যাবে তাই বা কে জানত? এখন ঠ্যালা সামলাও…..আজ ক্যানটিনে হাজিরা দাও তো কাল সিনেমা চল, ইত্যাদি প্রভৃতি। ধুর শালা জীবনে ঘেন্না ধরে গেলো…. আচ্ছা এরকম করলে হয় না ছেলেরা ছেলেদের সাথে প্রেম করবে, আর মেয়েরা মেয়েদের সাথে? অবশ্য করলেই হয়…..এখন তো ৩৭৭ উঠেই গেছে। আমি যদি কোনও দিন ও রাস্তায় হাঁটি তবে কার সাথে প্রেম করব? ফার্স্ট বয় নিখিল, নাকি খেলাধুলোয় সেরা অভ্রদীপ, নাকি cr ভাস্বর……না না এর কেউ নয়…..নরম সরম ছেলে খুঁজতে হবে…..পেয়েছি…..কাত্যায়ন….ছোটখাট রোগাসোগা ফরসা করে…..হ্যাঁ পড়াশোনা নিয়ে একটু হাইপার, তবে তৃণার ঠেকে বেশি manageable।
আমার এহেন চিন্তায় জল ঢেলে দিয়ে হঠাত্‍ মোবাইলটা বিকট ভাবে ভাইব্রেট করতে আরম্ভ করল……মাতৃদেবী। শহীদ তো আমি এখন……তিন ঘন্টা চুপচাপ কথা শুনতে হবে…… “ হ্যালো টুবলু, বাবা ভাল অছিস তো? খাওয়াদাওয়া ঠিকঠাক করছিস তো? রোদে ঘুরে ঘুরে যেন চেহারাটা কেলেকার্তিক করিস না” এতটা বলে মা নিশ্বাস নেবার জন্য থামে……এই সুযোগে আমি টুক করে কাজের কথাটা বলে ফেলি….. “ মা এবার আমাকে ল্যাপটপ কিনে দিতে বল না বাবাকে?” মা যেন কথাটা শুনতেই পায়নি… বলেই চলে “ হ্যাঁ রে? তৃণা ভাল আছে তো? দেখিস অমন সুন্দর লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো মেয়ে……ওকে দুঃখ দিস না কিন্তু…..ঝগড়া ঝাটি করিস না…..কী ভাল মেয়ে রে…..আমার জন্মদিনে ঠিক মনে করে উইশ করেছে…..আর তুই জানিস ও তো না বোধহয় আমার জন্মদিন কবে!ওকে দেখে শেখ, নাহলে তো লোকে বলবে বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা!”
মা এমন এমন কথা বলে না যে মুডটা চটকে আলুকাবলী হয়ে যায়…..আমি বাঁদর? আর তৃণা মুক্তো? না না মুক্তো কেন, ও তো কোহিনূর হীরে আর আমি? কোথায় আগরতলা কোথায় চৌকির তলা?
এক একটা দিন কেটে যায়….. আজ শনিবার…..আমার সাপ্তাহিক ওরাল পরীক্ষার দিন…….তৃণার কাছে…..আজ তৃণা টাইম দিয়েছে…..রাত্তির আটটা….ওর সাথে কলেজে। সে এক পর্ব….যেতেই আগে আমার সময়জ্ঞান নিয়ে তৃণা খুব ঝাড়বে…তারপর জামাটা দেখে বুঝতে চেষ্টা করবে কদিন কাচা হয়নি…দাড়ি নিয়ে খানিক বকবে….তারপর সব দেখে শুনে সন্তুষ্ট হলে কাছে বসে গলাটা জড়িয়ে ধরে গুনগুন করে প্রেমের কথা বলবে। আগে বেশ লাগতো…তৃণার গালটা আমার গালের সঙ্গে লেগে আছে, তৃণার হাত আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে, আর মাঝে মাঝে বেপরোয়া দুষ্টুমি তো আছেই। এখন মনে হয় সবই মায়া….তৃণার গুনগুন শুনতে গিয়ে শুধু এখন কলেজের ওই গুমোট গরমে মশার পো পো আওয়াজ শুনতে পাই….তৃণার কথা শুনতে শুনতে মাঝেমাঝে এত বিরক্ত লাগে…..যে এর থেকে কমমেড ক্লাস করাও শ্রেয় মনে হয়। শুধু মনে হয়….কখন এই বিরক্তিকর কান্ড থেকে ছাড়া পেয়ে শান্তিতে ভিডিও গেমস খেলবো।
আটটা বাজে….বেরব বেরব করছি, দেখি টিভিতে সেহবাগ পাকিস্তানের বোলারদেরকে এন্তার পেটাচ্ছে…..ভাবলাম century টা দেখেই যাই। তা ভবী বুলবার নয়……তৃণার ফোন, “কিরে আটটা পাঁচ হয়ে গেলো, কোথায় তুই?” বললাম “দাঁড়া century টা দেখে যাচ্ছি। “ না এক্ষুনি আয়…..এক্ষুনি আয়……আমি বলছি আয়…..” মাথায় আমার খুন চেপে গেলো….. “ হ্যাঁরে তৃণা তোর সাথে কী আমার চুক্তি হয়েছিল যে যখন বলবি তখন যেতে হবে? আমার এখন কাজ আছে আমি আসতে পারব না”
অকস্মাত্‍ রূঢ়তায় তৃণার গলা অভিমানে বুজে আসে….. “ বারে আমি যে এখানে দাঁড়িয়ে আছি?” “ তুই কী করবি সেটা তোর ব্যাপার, আমি যাব না ব্যাস…..” ফোন কেটে দিই….জাহান্নমে যাক সব।
ভালোই হয়েছে , তারপর থেকে চারদিন আর তৃণা আমাকে জ্বালায়নি…..আপদ চুকেছে। আমিও দিব্যি আছি…..খাচ্ছিদাচ্ছি, ওয়ার্ড যাচ্ছি না……গাইনির ক্লিয়ারেন্স দিতে গেলাম না…..ধুর….ফেল করালে করাবে….আমি তো আর তৃণা নই……যে এক নাম্বার ফাদার মাদার!যতসব খোরাক। মধ্যে থেকে ক্যাটরিনার নতুন বই তা দেখে এলাম…..একদম ফাটিয়ে দিয়েছে। তবে এবার একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে…..তৃণাকে কী ফোন করব? নাকি থাক আর দুদিন।
খেলার মাঠের ধারে বসে সাত পাঁচ ভাবছিলাম……দূরে সায়ন্তন, রুদ্রজিতরা ফুটবল প্র্যাকটিস করছিল। আমি বাবা ভিতু মানুষ…..কোনও রকমে শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে কুড়িটা বছর পার করেছি, আরো খান পঞ্চাশ বাঁচার ইচ্ছে রয়েছে। আনন্দবাজারে হেডলাইন্স হোক…..ফুটবলের ধাক্কায় যুবকের মৃত্যু…..স্টুডেন্ট ইউনিযন বলছে অন্তর্ঘাত…..তদন্তের দাবী…তা আমি চাইনা…ওসব বরং ওরাই খেলুক…..এখন খেলে নিক……চল্লিশ পেরোলেই সব ফুস ফুস করে হার্ট অ্যাটাক বা সেরিব্রাল স্ট্রোকে কেটে পড়বে….ভালোই হবে…..আমার কম্পিটিশন কমবে…..তখন আমি নাই বনে শিয়াল রাজা হয়ে সুখে দিন কাটাবো।
চুপিচুপি একটা বিড়ি ফুকে নিই….মাসের শেষ তো….সিগারেট কেনার মতো টাকা নেই আর….সাবধানে…..চারদিকে ছড়িয়ে আছে তৃণার চর…হেড অফিসে খবর গেলো বলে। আমি ভাবি তৃণার কী কোনও অদৃশ্য স্যাটেলাইট আছে?নাকি আমার শরীরে মাইক্রোমিনি ভিডিও চিপ লাগানো যে তৃণা আমার সব খবর পেয়ে যায়? অসম্ভব কিছু নয়, তৃণার বাবার যা পয়সা…..আমাকে দশবার কিনে দশবার বিক্রি করতে পারে। আর তাছাড়া ছেলেগুলো তো তেমনি…..কে আমার নামে বদনাম করে তৃণার কাছে নাম কিনবে , সেই চিন্তা শুধু। সুন্দরী মেয়ে দেখলে তো মুখ দিয়ে লাল গড়ায়….কুকুরের মতো লেজ নাড়তে নাড়তে চলল। তবে হ্যাঁ তৃণা মেয়েটার অনেক গুণ….মনে মনে আমার আর তৃণার গুণের লিষ্টি মেলাতে থাকি……
তৃণা আমি
তৃণা খুব সুন্দরী তৃণা আমার গার্লফ্রেন্ড
তৃণা তিন বছরে সাতটা অনার্স পেয়েছে ”
তৃণা দারুন নাচগান করে ”
তৃণা দারুণ খেলাধুলো করে ”
অতএব আমি রণে ভঙ্গ দিই….সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো বিবেক….বলে “ শুনছিস? তৃণা তো এবার ভলিবল টীম নামাবে স্পোর্টসে…..শুনেই মাথার ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে যায়! কী? আমার তৃণা ভলিবল খেলবে……ওর ওই টাইট জিনসটা পরে? আর এই লোফারগুলো খেলা দেখার নাম করে নানা রকম আওয়াজ দেবে?
বেশ তো করুক না…..তাহলে তো তৃণা ভালোই আছে, আমার সাথে কথা হল কী হল না, তা নিয়ে কোনও মাথাব্যথাই নেই ওর। কানটা জলে যায়…বিবেক বলতে বলতে যাচ্ছে… “তুই মাইরি মাল তুলেছিলি…..এক পয়সার মুরোদ নেই নিজের…..আর বউটা বিশ্বসুন্দরী! কী দেখে যে তৃণা তোকে ইয়েস করলো…….”
আমার মাথার ভেতর মনে হয় কেউ যেন গরম সিসে ঢেলে দিচ্ছে……এই সময় বাজতে থাকে মোবাইলটা….. “হ্যালো?” “অর্চি আর কতদিন রাগ করবি?ঠিক আছে আমি সরি…..প্লীজ আয় আজ দেখা করি!” “ আমার ইচ্ছে নেই” ঠান্ডা গলায় বলি আমি…. “অর্চি প্লীজ রাগ করিসনা” কাতর গলায় তৃণা বলে। “দেখ তৃণা আমার যা বলার আমি বলে দিয়েছি, আর সময় নষ্ট করতে পারছিনা….” “অর্চি, ছাড়িস না……অমন করছিস কেন? কী হয়েছে তোর? বল না অর্চি বল না…..প্লীজ……” ফোনটা কেটে দিই আমি…..তারপর ভাবলেশহীন মুখে কমন রুমে চলে যাই খেলা দেখতে। ফোনটা সাইলেন্ট করা……বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে পকেটে…… বেশ বুঝতে পারছি তৃণা পাগলের মতো ফোন করছে আমায়……।
তারপর তিনটে মাস কেটে গিয়েছে ক্যাম্পাসে……সোল্লাসে চলছে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, সারাদিনে ক্লাসের ভীড়ে মাঝে মাঝে তৃণাকে দেখতে পাই……ব্যাগ নিয়ে আস্তে আস্তে লাইব্রেরী চলেছে……বা ওয়ার্ড থেকে ফিরছে…..কেমন যেন উষ্কখুস্কো চুপচাপ হয়ে গেছে। আমার দিকে তাকায়না, মাথা নীচু করে চলে যায়…..
খুব কাঁদে কী রাতে আমার জন্যে? শরীরখারাপ করে যদি? চুলোয় যাক…..আমি জানি ওসব কাঁদেটাদে না….. রাত জেগে পড়ে, তাই আর কী। আর আমাকে দেখলে কথা বলতে ওর বয়েই গেছে……হাজার একটা ছেলে ওর পেছনে দিনরাত লাইন দিয়ে আছে। শরীরখারাপ করলে করবে, তাতে আমার কী?
আমি ভালোই আছি, খেলা দেখছি, পড়াশোনা করছি…..দিব্যি ঝাড়াঝাপটা…..কাউকে নিকেশ দেওয়ার নেই…..নিজের মতো করে নিজে বাঁচো। তবে মেজাজটা এরকম তিরিক্ষি হয়ে আছে কেন কে জানে…..লোককে উঠতে বসতে খিস্তি করছি……পড়ার চাপে বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।
মধ্যে টুক করে বাড়ি থেকে ঘুরে এলাম…..কী না দিদির ছেলে হয়েছে……ব্যাটা নিলয় এণ্ড কোম্পানির ওয়ারিস…..একটা প্যাত্প্যাতে নেড়ামুন্ডি বাচ্চা……তাকে নিয়ে বাড়ি শুদ্ধু অস্থির। আরে বাবা বাচ্চা তো লোকের আকছার হচ্ছে…..একজন যদি সোনার চেন দেয় তো আর একজন আংটি…আর আমার ল্যাপটপ?সে তো স্মৃতির গর্ভে বিলীন। আর গোদের ওপর বিষফোড়া…যেখানেই যাই……তৃণা কেমন আছে আর তৃণা কেমন আছে…এই কৈফিয়ত দিতে দিতে প্রাণ বেরিয়ে গেলো….
সন্ধ্যে থেকে গৌরবদের ঘরে মোদের আসর বসেছে…..আমিও চড়াচ্ছি দুই তিন পাত্তর…..আসলে মায়ের সাথে আজ হয়ে গেলো একচোট। আরে বাবা দিনের মধ্যে একশবার করে তোমার নাতি হেসেছে না কেঁদেছে, কাত্‍ ফিরেছে না চিত হয়েছে তার হিসেব শুনতে কার ভাল লাগে বলতো? দিনু বললো “চ অর্চি ছাদে যাই…..”
দুই পার্টনার মিলে হেঁড়ে গলায় গান গাইতে গাইতে ছাদে……বাঃ মাতাল হলে তো দিব্যি লাগে! আর দুপাত্তর খাওয়ার পর হটাত্‍ কুকুরগুলোর কান্না শুনে আমারও কান্না পেয়ে গেলো…..আমিও তো ওদের মতই নেড়িকুত্তা। আমি একা, আমাকেও কেউ ভালবাসে না, মা না, বাবা না, দিদি না, এমনকি তৃণাও না। মা আমাকে কত আদর যত্ন করতো….এখন তো জামাই আর নাতি নিয়েই অস্থির……এই সব শালা নিলয়ের চালিয়াতি…ব্যাটা কে বন্দুক চালিয়ে যদি না মেরেছি আমি…..তবে আমি সলমান খান নই……..আর দিদি……বরকে পেয়ে এখন কী আর ভাইয়ের কথা মনে থাকে……সব দুনম্বরী পীস…..তবে আমি এখন সব বুঝে গেছি, তাই এই যে মাল খেয়ে হালকা হালকা হালকা হয়ে যাচ্ছি…… রেলিঙের ওপর দাঁড়িয়ে পড়লাম…..দেখ তৃণা দেখ…..আমি পাখির মতো উড়ছি……শরীরটা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলাম…..তৃণা রে বড় কষ্ট, বড় অন্ধকার……….তারপর………………………
অনেক দূর থেকে কে যেন ডাকছে…. “অর্চি, অর্চি? অর্চিষ্মান?” সাড়া দিতে চেষ্টা করলাম…..স্বর বেরল না……চোখ খুলতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেলো…..এত আলো……কোথায় রে বাবা, স্বর্গে চলে এলাম নাকি? চোখটা সয়ে আসতে দেখলাম একটা খুব সুন্দর মুখ আমার মুখের ওপর ঝুকে আছে……..নিশ্চয় অপ্সরী টপ্সরী হবে……যা সুন্দর……এ বোধহয় উর্বশী। ও হরি উর্বশী আবার কাঁদে কেন? আমাকে পছন্দ হয়নি বোধহয়……তা ন্যায্য কথা…..আমি তো আর কোনকালেই কন্দর্পকান্তি ছিলাম না! তবে দিব্যদেহে কী খুব খারাপ দেখতে হবো?
উর্বশীকে এত চেনা চেনা লাগছে কেন? এতক্ষণে একটু একটু জ্ঞান ফিরে আসতে থাকে…..উর্বশী নয় উর্বশী নয়, তৃণা তৃণা তৃণা, আমার তৃণা…….চোখের জল আড়াল করতে মুখটা পাশে ফিরিয়ে নিই….পাস থেকে কে যেন বলে…… “ একিরে বাবা, অজ্ঞান হয়ে তো তৃণা তৃণা করে বিড়বিড় করছিলি…..জ্ঞান আসতেই রাগ?” “ আঃ প্রণয়”…….তৃণা হালকা ধমক দেয়….আমার মাথায় হাত রেখে বলে “জল খাবি অর্চি?” মাথা নেড়ে না বলি…..গলা দিয়ে স্বর বেরয় না তবু মনে মনে বলি……তৃণা তুই এসে গেছিস আমার সব তেষ্টা মিটে গেছে রে। ..এমন সময় হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকেন সেনস্যার…. সাথে বাবা……এই কদিনেই কেমন যেন বুড়িয়ে গেছেন! আমার চিন্তায় কী? তৃণা বলে “কাকু কাকু দেখুন অর্চি চোখ খুলেছে….আমার কথায় সাড়াও দিয়েছে”…..আমাকে ঘিরে আসতে থাকে মা বাবা নিলয়দা দিদি…..কারো চোখে জল, কারো চোখে রাতজাগা ক্লান্তি, আমার সব আপনজনেরা। হঠাত্‍ শিশুকণ্ঠে কে কেঁদে ওঠে…. শুনি মা বলছেন…..ইস মিলি, এখনো বাচ্চাটাকে খাওয়াসনি?দিদি অপরাধী গলায় বলে, “আসলে মা ভাইয়ের ওই অবস্থা দেখে আর টেনশনে কাল রাতে খেয়াল পড়েনি”। তৃণার হাত মুঠোয় নিয়ে আমার কান্না আসে…..আমি কী নিষ্ঠুর রে তৃণা……ওইটুকু শিশুকে আমি হিংসা করি…..আমি তোকে হিংসা করি তৃণা…. তোকে দুঃখ দিই, তোকে কাঁদাই।
ছমাস কেটে গেছে…এখন আমি চাঙ্গা…. ভাগ্যে নিমগাছটা ছিল নাহলে সেদিন রেলিং থেকে সোজা মাটিতে পড়লে আর রক্ষে ছিলনা। পপাত চ, মমার চ…ডিরেক্ট স্বর্গে গিয়ে অপ্সরীদের bellydance দেখতে হত। কপাল ভাল তাই হাড় কখানা ভেঙ্গেছিল……ফাইনাল প্রফ শেষ…..পাস করে যাব মনে হয়। তৃণাকে নিয়ে বাসে করে বাড়ি চললাম……শিলিগুড়ি টু কোলকাতা….. গ্রীনলাইনের এসি বাস। পুচকেটার মুখেভাত হবে….. তাই একটা টেডিবেয়ার নিয়েছি…..আর একটা দাবার বোর্ড……নিলয়দার সাথে এবার জমিয়ে দাবা খেলবো।
তৃণা আমার কাঁধে হেলে ঘুমিয়ে আছে পরম নির্ভরতায়…..ওর নরম মসৃণ গাল আমার খসখসে দাড়িয়লা গালে ঘসে যাচ্ছে বারবার…ওর লম্বা চুল উড়ে উড়ে পড়ছে আমার মুখে গলায়…..আর কী চাই, তৃণার হাত আমার হাতের মুঠোয়….আমি জানি আমি একা নই, মা বাবা দিদি নিলয়দা সবাই আমায় ভীষণ ভীষণ ভালবাসে……আর তৃণা আমায় ভালবাসে…..কোনও কারণ ছাড়াই ভালবাসে।
সিটে মাথা এলিয়ে দিই…..দূর দিগন্তে সূর্য উঠছে…সকাল কী সুন্দর!

Like it? Tweet it.

"একটি ক্যাম্পাস প্রেমের করুণ কাহিনী" by @bongbuzz

*

*

  1. Osadharon guru! Simply osadharon! Chotto, sundor, misti golpo! Aaj saradin bohut baaje gechhe aamar… din er sheshe tomar ei golpo ta aamar mon bhalo kore dilo!

  2. sotyi bolchi galpo ta porechi 1/2 hour hoye geche.. tobuo effect ta roye geche.. fatafati.. eto daag hoyto ar kon golpo e kate ni.. human emotions darun fute utheche,,,moral tao khub sundar.. relations brk hoy anek bhul bhal karon e.. tobuo karon gulo fele dewar moto na.. du pokkho kei mene nite hobe,.. bujhte hobe.. neem gach thakar guarantee nei o nei ar chokh khule premika k fire pawar o guarantee nei real lofe.. asadharon asadharon 10/10